Sunday, November 09, 2008

মণিপুরী নৃত্যকলার প্রসারে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনবদ্য ভুমিকা, রবীন্দ্রনাথের গানে মণিপুরী সুর এবং অন্যান্য প্রসংগ


মণিপুরী সংস্কৃতির সবচেয়ে সমৃদ্ধ শাখা মণিপুরী নৃত্য। মণিপুরী নৃত্যকলা তার কোমলতা, আঙ্গিক, রুচিশীল ভঙ্গিমা ও সৌন্দর্য দিয়ে জয় করেছে ভারতর্ষের অসংখ্য দর্শকের মন। শুধুমাত্র মণিপুরী জীবনধারা ও ধর্মাচরনের সাথে জড়িত এই নৃত্যকে বহির্বিশ্বে পরিচিত করান কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

কবিগুরুর ভ্রমনের ইতিহাস থেকে জানা যায় ১৯১৯ সালে তিনি সিলেট ভ্রমনে এলে ৬ই নভেম্বর সিলেট শহরের অদুরে মাছিমপুর পল্লীতে বেড়াতে আসেন। সেখানকার বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী মেয়েরা কবিগুরুকে অভ্যর্থনা জানান এবং পরে তার সম্মানে কবির বাংলোতে মণিপুরী নৃত্যের আসর আয়োজন করা হয়। দুপুরে কবিগুরুকে ঐতিহ্যবাহী মণিপুরী গোষ্ঠলীলা এবং রাতে মণিপুরী রাসলীলা দেখানো হয়। কবিগুরু মণিপুরী নৃত্যের সজ্জা, সাবলীল ছন্দ ও সৌন্দর্যে বিমোহিত হন এবং শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েদের এ নৃত্য শেখাবার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। নৃত্য পরিচালনায় ছিলেন বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী নৃত্যশিল্পী ইমাগো দেবী। ইমাগো দেবীকে কবিগুরু শান্তিনিকেতনে নিয়ে যেতে চাইলেও মণিপুরীদের কঠোর সামাজিক বিধিনিষেধের জন্য তা সম্ভব হয়নি।

কবিগুরুর আমন্ত্রনে প্রথমে মণিপুর থেকে তিনজন নৃত্যশিক্ষক শান্তিনিকেতনে আসেন , কিন্ত বাংলা জানা না থাকার কারণে তার ফিরে যান। এরপর ১৯২৬ সালে আগরতলা থেকে গুরু বুদ্ধিমন্ত সিংহ এবং ত্রিপুরা থেকে গুরু নবকুমার সিংহ শান্তিনিকেতনে যোগ দেন। প্রথমবারের মতো মনিপুরী নৃত্য ব্যবহার করে শান্তিনিকেতনে মঞ্চষ্থ হয় "নটীর পুজা" ও "ঋতুরঙ্গ"। ২য় পর্য়ায়ে কবিগুরুর আমন্ত্রনে যোগ দেন সিলেটের কমলগঞ্জের বালিগাঁও গ্রামের বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী নৃত্যগুরু নীলেশ্বর মুখার্জ্জী। এরপর শান্তিনিকেতনে মণিপুরী নৃত্যের জন্য আলাদা শাখা গঠন করা হয়।

রবীন্দ্রসংগীতের গভীরতা ও কাব্যময়তার সাথে মণিপুরী নৃত্যের সাবলীল গতি ও বিশুদ্ধ নান্দনিকতার মধ্যে বিশেষ সামঞ্জস্য থাকায় শান্তিনিকেতনে উচ্চাঙ্গ নৃত্যধারার মধ্যে মণিপুরী নৃত্য সর্বাপেক্ষা সমাদৃত হয়। এরপর বাংলাদেশে এবং সারা ভারতে মণিপুরী নৃত্যের প্রচার ও প্রসার ঘটে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ মণিপুরী গানের সুর ও তাল দিয়েও প্রভাবিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের "শ্যামা" ও "চন্ডালিকা" ও নৃত্যনাট্যে আংশিক এবং "চিত্রাংগদা " নৃত্যনাট্যে সম্পুর্নভাবে মণিপুরী নৃত্যের সুর ও তাল অনুসরন করা হয়েছে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনেক গানে মণিপুরী সুর ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন -


  • শ্রীবাস কাছে থেকে দুরে কেন ছিলগো আধাঁরে

  • আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে

  • রোদন ভরা এ বসন্ত

  • বাকি আমি রাখবো না

লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা মণিপুরী নৃত্যের বিশ্বময় প্রচার এবং মনিপুরী সংস্কৃতির পুনর্জাগরনে অসামান্য ভুমিকা রাখার জন্য মনিপুরীরা আজো কবিগুরুকে মণিপুরী নৃত্যের পথিকৃৎ হিসাবে বিবেচনা করেন। মণিপুরী নৃত্যগুরুরা আজো গভীর শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারন করেন কবিগুরুর নাম। সম্মানিত করার জন্য কবিগুরুর লেখা গান মণিপুরী রাসলীলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে । সিলেটের মাছিমপুরের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী পল্লীতে স্থাপন করা হয়েছে কবিগুরুর প্রতিকৃতি।



তথ্যসুত্রঃ
১. আকাংখা - শান্তিনিকেতনের পত্রিকা ১৩২৬ বাংলা
২. শ্রীভূমি সিলেটে রবীন্দ্রনাথ - অধ্যাপক নৃপেন্দ্রলাল দাস
৩. ভারতের নৃত্যকলা - গায়ত্রী চট্টোপাধ্যায়
৪. Tagore and his influence in Bishnupriya Manipuri Society